এমন কোনো কথা আপনার কানে এলো, যা সবাইকে বলা যাবে না। কিন্তু কাউকেই বলা যাবে না— এমন আপনি প্রতিশ্রুতিও দিলেন। বন্ধু কিংবা আত্মীয় কিংবা সহকর্মীকে জোর গলায় বললেন, ‘না না, কাক-পক্ষীতেও টের পাবে না। কেউ জানবে না।’
কিন্তু কথাটি কান থেকে পেট পর্যন্ত পৌঁছাতে পৌঁছাতেই পেট গুড় গুড় শুরু হয়ে গেল। কথাটা এমনই আকর্ষণীয় যে, কাউকে না বলে শান্তি পাচ্ছেন না। অস্বস্তি তুঙ্গে। নাহ! আর চেপে রাখা গেল না! অন্য এক ব্যক্তিকে ঠিক সেই কথাটাই বলে ফেললেন। তার কাছ থেকে এবার আপনিই প্রতিশ্রুতি নিলেন, যেন তিনি কাউকে না বলেন।
কিন্তু ধীরে ধীরে সেই ব্যক্তির সম্পর্কে তার চারপাশের মানুষ সচেতন হয়ে যান। তাকে কোনো গোপন কথা বলার আগে বন্ধুরা ১০ বার ভাবেন। কিন্তু কখনো ভেবে দেখেছেন— কথা চেপে রাখার যন্ত্রণা কেন হয়?
এই যে মনে কোনো কথা চেপে রাখা। শুনতে সহজ লাগলেও বাস্তবে তা অনেকের পক্ষেই কঠিন। কখনো কখনো এমন হয়— গোপন কথা মনে চাপ ফেলতে থাকে, কাউকে বলার পর হালকা লাগে। কেন হয় এমনটি? এতে পারপস্পরিক সম্পর্ক খারাপ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়? এ ঘটনা কমবেশি সবার জানা। এমনকি অনেকে জীবনেই ঘটেছে।
এ বিষয়ে মনোবিজ্ঞান বলছে, এর পেছনে রয়েছে গভীর কারণ। ব্যাখ্যা করলেন মনোবিদ আত্রেয়ী ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, এই ‘গোপন রাখা’ মানে শুধু চুপ থাকা নয়। এটা মানসিক চাপও তৈরি করে। যেন মনের ওপর এক অদৃশ্য বোঝা এসে পড়েছে। গোপনীয়তা রক্ষা আদপেই ভার। একটি দায়িত্ব আরোপিত হয়। যিনি সেই ভারকে বহন করতে পারছেন, তিনি ভরসাযোগ্য হয়ে উঠছেন। আর যিনি বহন করতে পারছেন না, তাকে হয়তো আর ভরসা করা যাচ্ছে না। এখানে কথা চেপে রাখাই যেন কোনো যোগ্যতার মাপকাঠি তৈরি হয়ে যাচ্ছে। কারও কারও ক্ষেত্রে দেখা যায়, গোপন কথাটি প্রকাশ করে দেওয়ার উগ্র বাসনা তৈরি হচ্ছে।
এ মনোবিদ আরও বলেন, ধরা যাক, দুজন প্রেম করছেন। একজন কথাটি গোপন রাখতে চাইছেন, অন্যজন সেই আনন্দের কথা শেয়ার করে নিতে চাইছেন আরও কারও সঙ্গে। সঙ্গীর সম্মান ধরে রাখার জন্য তিনি কাউকে বলছেন না।
তিনি বলেন, এই যে দুইয়ের ঘাত-প্রতিঘাত। একেই আমরা কগনিটিভ ডিজোন্যান্স বলতে পারি। কথাটা প্রকাশ করতে চাই, আবার গোপনও রাখতে চাই। এর মধ্যে যে কোনো একটাই জেতে। ব্যক্তি কথাটি বলে ফেলেন বা চেপে রাখেন। এর ভিত্তিতে সমাজে তার একটা পরিচিতি তৈরি হয়।
মনোবিদ আত্রেয়ী ভট্টাচার্য বলেন, এই ঘাত-প্রতিঘাত সামলানো অনেকের কাছেই কঠিন হয়ে ওঠে। সেই ভার লাঘব করতেই অনেকে গোপন কথাটি বলে ফেলেন। তখন গোপনীয়তা রক্ষার থেকেও ভার লাঘবের প্রয়োজনীয়তা বেশি সেখানে। একদিকে সত্যি বলতে চাওয়া, অন্যদিকে চুপ করে থাকার বাধ্যবাধকতা— এই টানাপোড়েন থেকেই আসে উদ্বেগ, অপরাধবোধ আর অস্বস্তি।
তিনি বলেন, ফলে মানুষ নিজেকে স্বাভাবিক বা স্বচ্ছ মনে করতে পারেন না। এ কারণেই অনেক সময়ে গোপন কথা বলে ফেললে এক ধরনের স্বস্তি আসে। কারণ তখন আর নিজেকে আটকে রাখতে হয় না। মনের ওপর চাপ কমে, নিজের সঙ্গে নিজের দ্বন্দ্বও কমে যায়।
এ মনোবিদ বলেন, তবে সব কথা সবার সঙ্গে শেয়ার করে নেওয়াও ঠিক নয়। হঠাৎ আবেগের বশে বলা কোনো কথা সম্পর্কের ক্ষতি করতে পারে বা নতুন সমস্যার জন্ম দিতে পারে। তাই কোথায়, কাকে, কতটা বলা উচিত, এ বোধও একান্ত গুরুত্বপূর্ণ। গোপন রাখা আর তা প্রকাশ করা, এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্যের প্রয়োজন। মনকে হালকা রাখতে যেমন কাউকে বিশ্বাস করে কথা বলা জরুরি, ঠিক তেমনই নিজেকে সুরক্ষিত রাখার জন্য কিছু কথা চেপে রেখে দেওয়াও প্রয়োজন।