গণতান্ত্রিক উত্তরণে খালেদা জিয়া এখনো অনিবার্য

সংবাদপত্র প্রতিবেদক
দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ছবি: সংগৃহীত
দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ছবি: সংগৃহীত

রাষ্ট্রযন্ত্রের নিপীড়ন, নির্যাতন, অপমান ও অপদস্থের বিরুদ্ধে একজন নারী একাই দাঁড়িয়ে ছিলেন। স্বামী হারানোর শোক আর সন্তানের শূন্যতা বুকে চেপে রেখে তিনি সমস্ত ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই করে গেছেন। দীর্ঘ লড়াই ও সীমাহীন যন্ত্রণায় তিনি ক্লান্ত হলেও কখনো ভেঙে পড়েননি, হাল ছাড়েননি। লড়াইয়ের ময়দানে ছিলেন অবিচল। অসীম সাহসের বাতিঘর হয়ে সমস্ত যন্ত্রণাকে পদদলিত করে ঠায় দাঁড়িয়ে থেকেছেন বাংলাদেশের সমন্বিত প্রতিচ্ছবি হয়ে। তিনি বাংলাদেশের আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। 

বর্তমানে এক কঠিন সময় পার করছেন হার না মানা এই নেত্রী। ফুসফুসে সংক্রমণসহ বিভিন্ন শারীরিক জটিলতা নিয়ে তিনি রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। ৮০ বছরের জীবনে নানা রোগ বাসা বেঁধেছে শরীরে, যা তার বর্তমান অবস্থাকে অত্যন্ত সংকটাপন্ন করে তুলেছে। গত কয়েক দিনে বেগম জিয়ার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে আইসিইউ-সমমানের হাই ডিপেন্ডেন্সি ইউনিটে (এইচডিইউ) রাখা হয়েছে। দেশের কোটি কোটি মানুষ তার সুস্থতার জন্য প্রার্থনা করছেন।

গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে বেগম খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন গণমাধ্যমে তার শারীরিক পরিস্থিতি তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, ‘চিকিৎসা গ্রহণ করতে পারছেন খালেদা জিয়া। অথবা বলা যায়, তিনি চিকিৎসা মেনটেইন করতে পারছেন। মেডিকেল বোর্ডের সিদ্ধান্ত ও খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসার জন্য তাকে বিদেশে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হবে।’

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বেগম খালেদা জিয়ার সুস্বাস্থ্য এই মুহূর্তে দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, গণতান্ত্রিক উত্তরণের এই সময়ে বেগম খালেদা জিয়া এখনো অনিবার্য। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও দেশের জন্য খালেদা জিয়ার ত্যাগকে অতি গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন তারা। 

তারা বলছেন, অসুস্থতা সত্ত্বেও অভ্যুত্থান পরবর্তী বর্তমান রাজনৈতিক পেক্ষাপটে বিএনপির চেয়ারপারসনের মতো অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদের চিন্তা ও মতামত এই মুহূর্তে ভীষণ জরুরি। বিশ্লেষকদের শঙ্কা, বেগম খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশ। কারণ, সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর অবস্থান এখন দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে।

সম্প্রতি তার জন্য দোয়া চেয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, ‘গণতান্ত্রিক উত্তরণের এই সময়ে খালেদা জিয়া জাতির জন্য ভীষণ রকম অনুপ্রেরণা।’

দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে বেগম খালেদা জিয়ার সুস্থ হয়ে ওঠা কতটা গুরুত্বপূর্ণ জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, ‘বেগম খালেদা জিয়া সারাজীবন দেশ ও জনগণের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য লড়াই করতে গিয়ে তাকে নিষ্ঠুরভাবে ফ্যাসিস্ট শাসকদের হাতে নির্যাতিত হতে হয়েছে। এ নিযাতন এতটাই কঠোর ছিল যে তিনি অসুস্থ হয়েছেন এবং তার জীবন বিপন্ন অবস্থায় পড়েছে। দেশের জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়েছেন, তবুও অন্যায়ের সঙ্গে আপস করেননি। তাইতো দেশের প্রতিটি দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দল এবং সব শ্রেণি-পেশার মানুষ তার প্রতি কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। এটি একজন রাজনৈতিক অভিভাবকের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসার প্রকাশ ছাড়া আর কিছু নয়।’

মাহবুব উল্লাহ বলেন, ‘জেল থেকে মুক্ত হওয়ার পর খালেদা জিয়া দেশের রাজনীতিতে একজন দিশারীর ভূমিকা পালন করেছেন। দেশের একজন মুরব্বি ও অভিভাবক হিসেবে তার নীরব ও নিঃশব্দ অনেক ভূমিকা দৃশ্যমান। মূলত তার উপস্থিতিই আগামীর প্রত্যাশিত গণতন্ত্রের জন্য বড় অনুপ্রেরণার শক্তি। তার এই অভিভাবকত্বকে সব রাজনৈতিক দল শ্রদ্ধার সঙ্গে গ্রহণ করেছে। এই অভিভাবকসুলভ চরিত্র তাকে আজীবন অমর করে রাখবে। এরই মধ্যে ইতিহাসে তার গৌরবোজ্জ্বল স্থান নির্ধারিত হয়ে গেছে।’

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত দল বিএনপির তখন কঠিন দুঃসময়। দেশে চলছে এরশাদের সমারিক শাসন। গভীর সংকটে দেশ। সেই সময় ঘোর অনীহা সত্ত্বেও প্রথমে কর্মী এবং পরে দলের হাল ধরতে রাজনীতির মাঠে নামতে হয় বেগম খালেদা জিয়াকে। সেই থেকে শুরু তার চার দশকের রাজনীতির পথচলা। এর মধ্যেই এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে সাহসী নেতৃত্ব দিয়ে দেশজুড়ে সাধারণ মানুষের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন আপসহীন নেত্রী। রাজনৈতিক অঙ্গনে পা রাখার আট বছরের মাথায় তিনি দেশের নির্বাচিত প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন।

এরপর তাকে নানা চড়াই-উৎরাই পার করতে হয়। কখনো সরকার প্রধান, কখনো বিরোধী দলের নেত্রী হয়ে সরব ছিলেন রাজপথে। এক-এগারোর সরকারের সময় এবং আওয়ামী লীগ সরকারের সময় খালেদা জিয়ার দুঃসহ কারাবন্দি জীবন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অন্যতম ট্রাজেডি। গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে বেগম খালেদা জিয়ার প্রতিজ্ঞা ও প্রতিশ্রুতিকে অগ্রগণ্য হিসেবে স্মরণ করেন রাজনৈতিক অঙ্গনের ব্যক্তিরা।

বর্তমান পরিস্থিতিতে খালেদা জিয়াই রাজনৈতিক ঐক্যের প্রতিশব্দ উল্লেখ করে ইতিহাসবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ছিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশের রাজনীতিতে বেগম খালেদা জিয়ার যে আপসহীন সংগ্রাম, সেটাই তাকে এই মুহূর্তে একজন অনিবার্য রাজনীতিবিদ হিসেবে দেশের অভিভাবকে পরিণত করেছে। দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র রক্ষার আন্দোনে বিষেশভাবে তার অনিবার্যতা তৈরি হয়েছে। এই মুহূর্তে তার উপস্থিতি খুবই দরকার। দলটির নেতাকর্মীদের কাছে বেগম জিয়া এক কথায় ‘সিম্বল অব ইউনিটি’। দেশের গণতন্ত্রকামী মানুষের কাছেও তিনি অন্যন্য ব্যক্তিত্ব।’

এলাকার খবর

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত