সাতক্ষীরা জেলার চারটি সংসদীয় আসনে বিএনপির বিপর্যয় নিয়ে নেতাকর্মীদের আত্মসমালোচনা জরুরি। সাতক্ষীরার একজন ভোটার হিসেবে আমার কাছে বিএনপির এই পরাজয় লজ্জার এবং বিব্রতকর। কেন এতো বিশাল ব্যবধানে প্রতিটি আসনে আমরা হেরেছি সেটি নিয়ে গবেষণা করা উচিত। আমার কাছে মনে হয়েছে, প্রতিটি আসনে প্রার্থীদের অতিমাত্রায় আত্মবিশ্বাস, স্টেট ম্যাকানিজম বিষয়ে অজ্ঞতা, সাংগঠনিক বিশৃঙ্খলা, ভুল প্রার্থীকে মনোনয়ন প্রদান, নিজ দলের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের অবজ্ঞা করা, সুশীল সমাজকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখা, ত্যাগী এবং পরিশ্রমীদের অবমূল্যায়ন, পরিবারকে অতিমাত্রায় প্রাধান্য, বিতর্কিত কিছু নেতাদের নির্বাচনী কার্যক্রমে যুক্ত রাখা ভরাডুবির অন্যতম কারণ। জেলা ছাত্রদল এবং যুবদলের কমিটি না থাকাও নির্বাচনে বড় ধরণের প্রভাব ফেলেছে। ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা নিয়োগে জামায়াতিদের একক নিয়ন্ত্রণ বিপর্যয় ডেকে এনেছে। সাতক্ষীরা-৩ আসনে ভুল ব্যক্তির হাতে মনোনয়ন যাওয়ায় বাকি আসনগুলোয় ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। স্বতন্ত্র নির্বাচন করে বিএনপির প্রার্থী কাজী আলাউদ্দীনের চেয়ে দ্বিগুন ডা. শহিদুল আলম ১ লাখ ৫ হাজার ভোট পেয়েছে। সাড়ে চার লাখ হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোটারদের কাছে টানতে পারেননি বিএনপি মনোনীত প্রার্থীরা। সাতক্ষীরায় আওয়ামী লীগকে হুমকি দিয়েছে বিএনপি জামায়াত করেছে জামাই আদর।
এবার বিএনপি যে চারজন প্রার্থী নির্বাচন করেছে তাদের মধ্যে তুলনামুলক ইয়ং প্রার্থী ছিলো ড. মনিরুজ্জামান। বাকি তিনজনের বয়স ৬০ প্লাস। হঠাৎ ভোটের মাঠে আসা মনির সবচেয়ে বেশি ভালো করেছে। তবে মনিরের ভোটের মাঠের হঠাৎ প্রত্যাবর্তন দলীয় নেতাকর্মীরা বিভক্ত হয়ে পড়ে। প্রথমদিকে ভালোভাবে গ্রহণ করতে পারেনি। ক্লিন ইমেজের তবে অর্ন্তকোন্দল, আওয়ামী লীগের ভোট জামায়াতের বক্সে যাওয়াতে ক্ষতি হয়েছে। বয়স্ক নেতৃত্বের চেয়ে ইয়ং নেতৃত্বে এবার আস্থাশীল ছিলো সাতক্ষীরার জাতীয়তাবাদী ভোটাররা। সাতক্ষীরা-৪ আসনে সবচেয়ে কম ভোটের ব্যবধানে হেরেছে বিএনপি। জামায়াত-বিএনপির ব্যবধান ছিলো ২১ হাজার ভোট। সবচেয়ে বেশি ব্যবধানে হেরেছে সাতক্ষীরা-২ আসনে। ব্যবধান ১ লাখ ৫০ হাজার ৬৬৬ জন। এতো ব্যবধানের অন্যতম কারণ ভঙ্গুর নেতৃত্ব, অর্ন্তকোন্দল প্রকট। প্রার্থীর মুখের ভাষা ভোটারদের আকৃষ্ট করতে ব্যর্থ হয়। আব্দুর রউফ বহিস্কৃত থাকা অবস্থায় মনোনয়ন প্রাপ্ত হওয়ায় অনেকেই নাখোশ হন।
ঐতিহ্যগতভাবে সাতক্ষীরা-১ আসনটি বিএনপির। প্রার্থী হাবিবুল ইসলাম হাবিব সাহেব নিজ উপজেলায় বেশিরভাগ ইউনিয়নে হেরেছে। কারণ কয়দিন আগে গঠিত ইউনিয়ন বিএনপির কমিটিতে যাদের আনা হয়েছে তাদের কারোর কোন ইউপিতে নূন্যতম আবেদন ছিলো না। ১২টি ইউপির যে ৩৬জন দায়িত্ব দেয়া হয় তাদের ৩০জনই ছিলেন ব্যালেন্স আওয়ামী লীগার। তাহলে রাজপথের ত্যাগী, নির্যাতিত, নিপীড়িতরা কেন ইউপির বিতর্কিত নেতাদের সাথে রাজনীতি করবে? এই ক্ষোভ থেকে দলের বড় একটি অংশ দলের বিপক্ষে কাজ করে। অতিরিক্ত আওয়ামী লীগকে প্রাধান্য দেয়া, নিজদলের প্রতিপক্ষের প্রতি তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা, ভোটের পর ভয়-ভীতি প্রদর্শন, গাড়িবহর মামলার আসামীদের বেপরোয়া আচরণ, শিক্ষিত সমাজকে অসম্মান এবং ভোটের মাঠে মন্ত্রীত্বের প্রচারণা ঠিক হয়নি। পরিবারের প্রচারণার স্টাইল ভোটারদের আকৃষ্ট করতে পারেনি। ভোটের আগেই এ বিষয়ে সতর্ক করে চক্ষুশূল হয়েছি। এই সীটে যে স্টেট ম্যাকানিজম হবে সেটিও প্রার্থীর পরিবারকে অবগত করেছিলাম। কিন্তু কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়েনি। যার ফলাফল ২৩ হাজার ৭৭৭জন ভোটের ব্যবধানের ধানের শীষের পরাজয়।
আমাদের দুর্ভাগ্য সুবর্ণ সুযোগ মিস করেছি। শুধুমাত্র সময়োপযোগী এবং বাস্তবভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে না পারার কারণে। প্রার্থীরা পরাজিত হলেও বিএনপির রাজনীতি সচল থাকবে। দলকে আবার সুসংগঠিত করতে হবে। তরুণ নেতৃত্ব হতাশ হলে চলবে না বরং সাংগঠনিক দুর্বলভিত্তির উপর নতুন করে শক্তিশালী সাংগঠনিক ভিত্তি গড়ে তুলতে হবে। সকল ভেদাভেদ ভুলে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে যেতে হবে। সাতক্ষীরায় আসলে জামায়াত জিতেনি, হেরেছে বিএনপি। পরিকল্পিতভাবে হারানো হয়েছে।
[সাইদুর রহমান,দৈনিক ইত্তেফাকের সিনিয়র রিপোর্টার, নির্বাচন ও রাজনীতি বিশ্লেষক]