আজ শনিবার নেত্রকোণায় ২৯তম বসন্তকালীন সাহিত্য উৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছে। এবছর কবিতায় খালেকদাদ চৌধুরী সাহিত্য পুরস্কার পেলেন বাংলাদেশের খ্যাতিমান কবি ও সম্পাদক আব্দুল হাই শিকদার ও গবেষক আব্দুল্লাহ আল মাসুমকে। সকাল থেকে দিনভর চলা অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন দেশ বিদেশের লেখক কবি শিল্পি ও সাহিত্যিকগণ।
শহরের মোক্তারপাড়া এলাকায় পাবলিক লাইব্রেরি চত্বরের বকুলতলায় সকাল নয়টার দিকে জাতীয় সঙ্গীতের মাধ্যমে জাতীয় ও সাংগঠনিক পতাকা উত্তোলন করেন মো. সাইফুর রহমান ও সংগঠনের সভাপতি মো. কিবরিয়া চৌধুরী। এরপর শোভাযাত্রা শেষে জেলা উদীচী পরিবেশনায় অনুষ্ঠিত হয় ‘বসন্ত বন্দনা। বসন্ত উৎসবটিতে যোগ দিয়ে খুশি নতুন প্রজন্মে জেনজিরাও।
এছাড়া শিশুদের চিত্রাঙ্কন স্বরচিত কবিতা, ছড়া ও গল্প পাঠ। অনুষ্ঠানে নেত্রকোনা ও বৃহত্তর ময়মনসিংহ ছাড়াও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কবি সাহিত্যিকরা প্রতিবছর উৎসবে যোগ দেন। বিকেল চারটায় পুরস্কার প্রদানসহ জমকালো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। অবরুদ্ধ সংস্কৃতি পুনরুদ্ধারে এধরণের আয়োজন আরো বড় পরিসরে করার দাবি অংশগ্রহণকারীদের।
নেত্রকোনা সাহিত্য সমাজ ১৯৯৭ সাল থেকে প্রতিবছর পহেলা ফাগুনে একজন বরেণ্য লেখক, কবি, সাহিত্যিককে এ পুরস্কার দেয়। এ ধরণের আয়োজন গণতন্ত্র বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে দাবি আয়োজকদের।
১৯৯৭ সাল থেকে প্রতি বছর পহেলা ফাল্গুনে বসন্তকালীন সাহিত্য উৎসবের আয়োজন করে আসছে নেত্রকোনা সাহিত্য সমাজ। উৎসবে প্রতি বছর একজন দেশবরেণ্য সাহিত্যিককে খালেকদাদ চৌধুরী সাহিত্য পুরস্কার দেওয়া হয়। এ বছর বাংলা কবিতায় অসমান্য অবদানের জন্য পুরষ্কার পান দৈনিক যুগান্তরের সম্পাদক কবি আবদুল হাই শিকদার। তার পক্ষে পুরষ্কারটি গ্রহণ করেন দৈনিক যুগান্তরের জেলা প্রতিনিধি কামাল হোসাইন।
আবদুল হাই শিকদার ১৯৫৭ সালের ১ জানুয়ারি কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারী উপজেলার দুধকুমার নদের তীরে দক্ষিণ ছাট গোপালপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ওয়াজেদ আলী এবং মা হালিমা খাতুন। আবদুল হাই শিকদারের লেখালেখির শুরু স্কুলজীবন থেকেই, বিকাশ আশির দশকে। কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, শিশুসাহিত্য, গবেষণা, সম্পাদনাসহ সাহিত্যের প্রায় সব শাখায় আবদুল হাই শিকদার রেখেছেন অসামান্য প্রতিভার স্বাক্ষর। এ যাবত তার প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ১২০।
আবদুল হাই শিকদারের স্বপ্ন ছিল চে গুয়েভারা হওয়ার। পুরো পরিবার অংশ নিয়েছিল মুক্তিযুদ্ধে। মানবতা, মহান স্বাধীনতা, জাতীয়তাবাদী চৈতন্যের ধারক এই কবির মুখে সবসময় ধ্বনিত হয়েছে প্রেম, প্রকৃতি, বিশ্বমানবতা, শোষণমুক্ত বৈষম্যহীন সমাজ, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের কথা। এজন্য ১৯৯৬ সালের ২৫ সেপ্টেম্বরে কবি সন্ত্রাসী হামলার শিকার হলেও মানবমুক্তির স্বপ্ন, মুক্তচিন্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে তিনি ছিলেন আপোষহীন।
আবদুল হাই শিকদার সাংবাদিকদের সংগঠন ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) দুইবারের নির্বাচিত সভাপতি। নির্বাহী পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন নজরুল ইনস্টিটিউটে। নজরুলের ওপর নির্মাণ করেছেন তিনটি তথ্যচিত্র। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম নিয়মিত সাহিত্য মাসিক ‘এখন’-এর তিনি কান্ডারি। বাংলাদেশ টেলিভিশনের শিকড় সন্ধানী ম্যাগাজিন ‘কথামালার’ পরিকল্পক, উপস্থাপক। কবিতার জন্য পেয়েছেন বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ বেশ কিছু পুরস্কার।
অন্যদিকে আব্দুল্লাহ আল-মাসুম ১৯৭১ সালে নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ উপজেলার জালালপুর গ্রামের ঐতিহ্যবাহী কাজী বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা এম. এ. কাদের ছিলেন একজন পুলিশ পরিদর্শক, মা কাজী হাজেরা খাতুন গৃহিণী। প্রফেসর ড. আল-মাসুম বিগত দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে বাংলার মুসলমানদের শিক্ষা, সমাজ, সংস্কৃতি নিয়ে গবেষণা করছেন।
বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত তার ‘বাংলার মুসলিম সমাজে আধুনিক শিক্ষার অগ্রগতি (১৮৮৫-১৯২১) ও ‘ব্রিটিশ আমলে বাংলার মুসলিম শিক্ষা: সমস্যা ও প্রসার’ বই দুটি দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়ানো হয়। আঞ্চলিক ইতিহাস নিয়ে ‘নেত্রকোণার শিক্ষার ইতিহাস ও আঞ্জুমান মডেল হাই স্কুল’ শীর্ষক গবেষণামূলক গ্রন্থ। তাছাড়া তার প্রায় ৩৫টি গবেষণা প্রবন্ধ, বুক চ্যাপ্টার বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, জাপান, তুরস্ক, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।
বসন্তকালীন সাহিত্য উৎসবের আগে ৩১ জন কবি-সাহিত্যিককে খালেকদাদ চৌধুরী সাহিত্য পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।
পুরস্কৃতরা হলেন- যতীন সরকার, আনিসুজ্জামান, কবীর চৌধুরী, হুমায়ুন আহমেদ, নির্মলেন্দু গুণ, রাহাত খান, হেলাল হাফিজ, রফিক আজাদ, বুলবন ওসমান, মহাদেব সাহা, জাফর ইকবাল, নাসরিন জাহান, আবু হাসান শাহরিয়ার, সেলিনা হোসেন, সেলিম আল দীন, আলতাফ হোসাইন, আনিসুল হক, জাকির তালুকদার, মোহাম্মদ রফিক, মোহাম্মদ নুরুল হক, আসাদ চৌধুরী, সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম, খালেদ মতিন (মরণোত্তর), রফিকউল্লাহ খান, মারুফুল ইসলাম, কামাল চৌধুরী, শামসুজ্জামান খান (মরণোত্তর), শামীম রেজা, পাপড়ি রহমান, গোলাম ফারুক খান, হাসান হাফিজ।