দখলদার ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ইরানে হামলা চালিয়ে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারির ওই আগ্রাসনের পর হাতের মুষ্ঠি ছেড়ে দিয়েছে তেহরানও। ঝাঁকে ঝাঁকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়ছে উগ্র ইহুদিবাদী ভূখণ্ড ও উপসাগরীয় দেশগুলোয় মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনা লক্ষ্য করে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এটিকে বিশাল সামরিক অভিযান বলছেন, আর তার প্রশাসন ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামে অভিহিত করেছে। এই আগ্রাসনের অংশ হিসেবে পুরো ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে।
এই উত্তেজনা বাড়ায় ইতোমধ্যে অনেক হতাহতের ঘটনা ঘটেছে এবং পুরো অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা ও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
হামলা অব্যাহত থাকায় প্রশ্ন উঠেছে: যুক্তরাষ্ট্র কি এখন প্রকৃতপক্ষে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত? কেন ওয়াশিংটন এই হামলার সিদ্ধান্ত নিল? আর এই সংঘাত কি মার্কিন স্থলসেনা মোতায়েন পর্যন্ত গড়াতে পারে?
হামলায় নিহতের সংখ্যা কত
ইরানি রেড ক্রিসেন্টের তথ্য অনুযায়ী, ইরানে অন্তত ৭৮৭ জন নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা অব্যাহত রাখায় এবং ইরান এর পাল্টা জবাব হিসেবে দখলদার ইসরাইল ও ওই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছোড়ায় এখন পর্যন্ত ছয় মার্কিন সেনা নিহত এবং ১৮ জন আহত হয়েছেন।
মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ জানান, একটি প্রজেক্টাইল (ক্ষেপণাস্ত্র বা গোলা) আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করে একটি সুরক্ষিত মার্কিন সামরিক অবস্থানে আঘাত হেনেছে। তিনি স্থাপনাটির অবস্থান প্রকাশ না করলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে, হতাহতের এই ঘটনা কুয়েতে ঘটেছে।
হেগসেথ বলেন, ‘আমাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে এবং অনেক আক্রমণ ধেয়ে আসে, যার বেশিরভাগই আমরা রুখে দিই। আমাদের প্রতিরক্ষা কর্মীরা অসাধারণ।’
তিনি আরও বলেন, ‘দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, মাঝে মাঝে একটি হয়তো লক্ষ্যভেদ করে বেরিয়ে যায়—যাকে আমরা ‘স্কোয়ার্টার’ বলি—এবং এই নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সেটি একটি টেকটিক্যাল অপারেশন সেন্টারে আঘাত হেনেছে।’
ইরানে সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনাটি ঘটেছে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় শহর মিনাব-এ, যেখানে একটি প্রাথমিক বালিকা বিদ্যালয়ে হামলা চালানো হয়েছে। এতে অন্তত ১৬৫ জন শিশু ছাত্রী নিহত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র কি ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত
মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী কেবল কংগ্রেসের যুদ্ধ ঘোষণা করার একচ্ছত্র ক্ষমতা রয়েছে, তবে প্রেসিডেন্ট ‘কমান্ডার-ইন-চিফ’ হিসেবে তাৎক্ষণিক হুমকির মোকাবিলা করার ক্ষমতা রাখেন।
হ্যামলাইন ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও আইন বিভাগের অধ্যাপক ডেভিড শুল্টজ ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘আমাদের সংবিধানের ১ নম্বর অনুচ্ছেদের ৮ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে যে, যুদ্ধ ঘোষণা করার একচ্ছত্র অধিকার কেবল কংগ্রেসের।’
তিনি আরও বলেন, ‘২ নম্বর অনুচ্ছেদের ৩ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট হলেন সামরিক বাহিনীর প্রধান বা কমান্ডার ইন চিফ।’
শুল্টজ ব্যাখ্যা করেন যে, প্রকৃতপক্ষে যুক্তরাষ্ট্র সর্বশেষ আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। এরপর ভিয়েতনাম বা ইরাকের মতো সংঘাতগুলো কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছাড়াই সংঘটিত হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘তাই আমি যুক্তি দেব যে, মার্কিন ইতিহাস দেখলে দেখা যায় বেশিরভাগ সংঘাতই আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত যুদ্ধ ছিল না, বরং প্রেসিডেন্টরা আমাদের সেগুলোর দিকে টেনে নিয়ে গেছেন।’
১৯৭৩ সালে কংগ্রেস ‘ওয়ার পাওয়ারস রেজোলিউশন’ পাস করে, যার উদ্দেশ্য ছিল প্রেসিডেন্টের একতরফা সামরিক পদক্ষেপের সময়সীমা ৬০ দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা। এই আইন অনুযায়ী, শত্রুতা শুরু হওয়ার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে প্রেসিডেন্টকে অবশ্যই কংগ্রেসকে অবহিত করতে হবে।