রমজান মাসে নবীজি (সা.) রাতে কী আমল করতেন?

সংবাদপত্র প্রতিবেদক
 ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

রমজান মাস আল্লাহর বিশেষ রহমত, বরকত ও ক্ষমার মাস। এ মাসে ইবাদতের মর্যাদা অন্য সময়ের তুলনায় বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) রমজান আসার আগেই এর জন্য প্রস্তুতি নিতেন এবং রমজান শুরু হলে পার্থিব কাজ কমিয়ে ইবাদত-বন্দেগিতে অধিক মনোযোগ দিতেন। বিশেষ করে রাতের সময় তিনি বিভিন্ন নফল ইবাদত ও আমলে গভীরভাবে নিমগ্ন থাকতেন। তার এই আমলগুলোই মুসলমানদের জন্য উত্তম আদর্শ। রমজানের রাতে নবীজি (সা.) যে গুরুত্বপূর্ণ আমলগুলো করতেন, তার কয়েকটি সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো

রমজান মাসে নবীজি (সা.) বেশি বেশি কুরআন তিলাওয়াত করতেন। এ সময় কুরআনের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক আরও গভীর হয়ে উঠত। হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন—

كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ أَجْوَدَ النَّاسِ، وَكَانَ أَجْوَدُ مَا يَكُونُ فِي رَمَضَانَ حِينَ يَلْقَاهُ جِبْرِيلُ، وَكَانَ يَلْقَاهُ فِي كُلِّ لَيْلَةٍ مِنْ رَمَضَانَ فَيُدَارِسُهُ الْقُرْآنَ

‘রমজান এলে প্রতি রাতে জিবরাইল (আ.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে আসতেন এবং তারা একে অপরকে কুরআন তিলাওয়াত করে শোনাতেন।’ (বুখারি ৩৫৫৪)

তারাবিহ নামাজ

রমজানে তারাবিহর নামাজ একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। রোজা ফরজ হওয়ার পরের বছর রাসুলুল্লাহ (সা.) কয়েক রাত সাহাবিদের নিয়ে মসজিদে তারাবির নামাজ আদায় করেছিলেন। প্রথম রাতে তিনি মসজিদে নামাজ পড়লে সাহাবিরাও তার সঙ্গে অংশ নেন। দ্বিতীয় রাতে আরও বেশি সাহাবি উপস্থিত হন। এভাবে তিন দিন চলার পর চতুর্থ রাতে তিনি আর মসজিদে যাননি।

পরে সাহাবিরা জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, আমি আশঙ্কা করেছি— এ নামাজ তোমাদের ওপর ফরজ করে দেওয়া হতে পারে, তখন তা তোমাদের জন্য কষ্টকর হয়ে যাবে। পরবর্তীকালে হজরত আবু বকর (রা.) ও বিশেষভাবে হজরত ওমর (রা.)-এর সময় তারাবিহর জামাত নিয়মিতভাবে চালু হয়।

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

مَنْ قَامَ رَمَضَانَ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ

‘যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে সওয়াবের আশায় রমজানে রাতের নামাজ (তারাবিহ) আদায় করবে, তার পূর্বের গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।’ (বুখারি ২০০৮)

রাকাতের বেশি সালাত আদায় করতেন না। তিনি চার রাকাত পড়তেন—যার সৌন্দর্য ও দীর্ঘতা বর্ণনার অতীত। এরপর আবার চার রাকাত পড়তেন এবং শেষে তিন রাকাত বিতর আদায় করতেন।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসুল! আপনি কি বিতরের আগে ঘুমিয়ে পড়েন? তিনি বললেন—

تَنَامُ عَيْنَايَ وَلَا يَنَامُ قَلْبِي

‘আমার চোখ ঘুমায়, কিন্তু আমার হৃদয় ঘুমায় না।’ (বুখারি ৩৫৬৯)

সেহরি

প্রতিটি রোজার জন্য রাসুল (সা.) সেহরি গ্রহণ করতেন। তিনি সাহাবিদেরও সেহরি খেতে উৎসাহ দিতেন এবং সুবহে সাদিকের কিছুক্ষণ আগে সেহরি করতেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

تَسَحَّرُوا فَإِنَّ فِي السَّحُورِ بَرَكَةً

‘তোমরা সেহরি খাও, কেননা সেহরিতে বরকত রয়েছে।’ (বুখারি ১৯২৩)

অন্য এক হাদিসে সাহাবি জায়েদ বিন সাবিত (রা.) বলেন—

تَسَحَّرْنَا مَعَ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ ثُمَّ قُمْنَا إِلَى الصَّلَاةِ

‘আমরা আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর সঙ্গে সেহরি খেয়েছি, এরপর তিনি নামাজের জন্য দাঁড়ালেন। বর্ণনাকারী জিজ্ঞাসা করলেন, সেহরি ও ফজরের আজানের মধ্যে কত সময় ছিল? তিনি বললেন—

قَدْرُ خَمْسِينَ آيَةً

‘প্রায় ৫০ আয়াত তিলাওয়াত করার পরিমাণ সময়।’ (বুখারি ১৯২১)

এ ৫০ আয়াত বলতে মধ্যম দৈর্ঘ্যের আয়াত বোঝানো হয়েছে, যা তিলাওয়াতে প্রায় ১৫–২০ মিনিট সময় লাগে।

ইফতার

ইফতার করা একটি ইবাদত এবং এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত। রমজানজুড়ে নবীজি (সা.) সূর্যাস্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইফতার করতেন। ইফতারে বিলম্ব না করার ব্যাপারে তিনি বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছেন। ইফতার শেষে তিনি সাহাবিদের নিয়ে মাগরিবের নামাজ জামাতে আদায় করতেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

لَا يَزَالُ النَّاسُ بِخَيْرٍ مَا عَجَّلُوا الْفِطْرَ

‘মানুষ ততদিন কল্যাণের ওপর থাকবে, যতদিন তারা দ্রুত ইফতার করবে।’ (বুখারি ১৯৫৭)

রমজান মাসে মহানবী (সা.)-এর রাতের জীবন ছিল ইবাদত, কুরআন তিলাওয়াত, নামাজ ও দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর সঙ্গে গভীর সম্পর্ক স্থাপনের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তার আমলগুলো শুধু ব্যক্তিগত ইবাদতের শিক্ষা নয়, বরং পুরো উম্মতের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনপদ্ধতির নির্দেশনা। তাই একজন মুমিনের উচিত রমজানের রাতগুলোকে মূল্যবান মনে করে কুরআন তিলাওয়াত, তারাবিহ, তাহাজ্জুদ, সেহরি ও সময়মতো ইফতারের মতো সুন্নত আমলগুলো অনুসরণ করা। এতে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের পাশাপাশি রমজানের প্রকৃত শিক্ষা ও বরকত লাভ করা সম্ভব হবে।

এলাকার খবর

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত