এক-এগারোবিরোধী ছাত্রদল নেতারা কেমন আছে?

রাশেদুজ্জামান, স্টাফ রিপোর্টারঃ
এক-এগারোবিরোধী ছাত্রদল নেতারা কেমন আছে, সংবাদপত্র ছবি:
এক-এগারোবিরোধী ছাত্রদল নেতারা কেমন আছে, সংবাদপত্র ছবি:

আমার আবাসিক হল ছিল স্যার এ এফ রহমান হল। সে সময় হলে ছাত্রদলের তিনটি গ্রুপ সক্রিয় ছিল। হল সভাপতির গ্রুপ সুলতান সালাউদ্দিন টুকু ভাইকে মেইনটেইন করত, সেক্রেটারির গ্রুপ সাহাবুদ্দিন লাল্টু ও বস টিটু ভাইকে মেইনটেইন করত। আমাদের গ্রুপটি ছিল সাংগাঠনিক সম্পাদক হিমেল ভাইয়ের নেতৃত্বাধীন একটি মিক্সড গ্রুপ।

আমাদের গ্রুপের সিনিয়রদের বড় একটি অংশ সাইফুল ইসলাম ফিরোজ ভাইকে মেইনটেইন করতেন। সে সুবাদে বলা যায়, আমি-আমরা মূলত ফিরোজ ভাইয়ের গ্রুপের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। পাশাপাশি আশিক ভাইয়ের সঙ্গে মামুনুর রশিদ মামুন ভাইয়ের সম্পর্কের কারণে আমার কিছুটা সম্পৃক্ততা মামুন ভাইয়ের গ্রুপের সঙ্গেও ছিল। 

তখন ছাত্রদলের রাজনীতি ছিল রমরমা। দল ক্ষমতায় থাকায় কর্মী-সমর্থকের অভাব ছিল না। এই ধারায় প্রথম বড় ভাটা লক্ষ্য করি ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরের পর। ওই ঘটনার পর ছাত্রলীগের ধর্মঘটের অজুহাতে অধিকাংশ বিভাগে ক্লাস ও পরীক্ষা বন্ধ হয়ে যায়। ফলে হলের বেশিরভাগ শিক্ষার্থী বাড়িতে চলে যায়।

ছাত্রদলের মিছিলগুলো ৪০-৫০ জনে নেমে আসে। অনেকেই যারা এতদিন ছাত্রদল করত, তারা অবস্থান বদলে ছাত্রলীগে যোগ দেয়। সে সময় হলে তিনটি গ্রুপ মিলিয়ে ছাত্রদলের যে কয়েকটি মিছিল হয়েছিল, তার প্রতিটিতেই আমি নিয়মিত অংশগ্রহণ করেছি।

এরপর আসলো কুখ্যাত ১/১১। বিএনপির রাজনীতির সবচেয়ে কঠিনতম সময়। ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের সিনিয়র নেতাদের বেশিরভাগই আড়ালে চলে গেল। সংস্কারপন্থী নাম দিয়ে স্বয়ং বিএনপি মহাসচিব আব্দুল মান্নান ভূইয়াসহ অসংখ্য সিনিয়র বিএনপি নেতা জিয়া পরিবারকে রাজনীতি থেকে মাইনাসের নগ্ন ষড়যন্ত্রে যুক্ত হল। ২০০৭ সালের ৭ মার্চ তারেক রহমানকে গ্রেপ্তার করা হলো। 

এই গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে সারাদেশের কোথাও তেমন মিছিল হয়েছিল কিনা আমার জানা নেই। তবে এক-এগারোর সরকারের জরুরি অবস্থা ভঙ্গ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের ৫০-৬০ জনের একটি বিক্ষোভ মিছিল হয়ে। বজলুর রহমান আবেদ ভাই, আশিক ভাই, করিম সরকার ভাইসহ মাত্র ৫০-৬০ জনই সেই মিছিলে অংশ নিয়েছিল।

সেই মিছিলে আমারও যোগ দেওয়ার কথা থাকলেও সত্যি কথা বলতে সাহসের অভাবে আর যোগ দেওয়া হয়নি। তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সহ-আইন সম্পাদক আশিক ভাই আমাকে মিছিলে আসার জন্য বললে আমি মিছিলে যোগ দেওয়ার জন্য বের হই। চারিদিকের সার্বিক অবস্থা দেখে কলা ভবনের সামনে এসে আমি আর মিছিলে যোগ না দিয়ে ডাকসু সংগ্রহশালার ভেতরে গিয়ে বসে থাকি। 

এই মিছিলটি ছিল ১/১১ সরকারের বিরুদ্ধে প্রথম কোন রাজনৈতিক বড় প্রতিবাদ। ফলে গোয়েন্দা সংস্থার লোকেরা সেই মিছিলে অংশগ্রহণকারীদের হন্য হয়ে খোঁজা শুরু করে। এরপর হলের ছাত্রদল নেতারাও বেশিরভাগ আড়ালে চলে যায়। 

প্রায় পাঁচ মাস পর, ২০০৭ সালের ২০ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র আন্দোলন শুরু হয়। লোকপ্রশাসন ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সেনা সদস্যদের সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয় উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এই ঘটনাকে এক-এগারো সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে ছাত্রদল নেতারাই মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। 

খোমেনি ইহসানের নেতৃত্বে আন্দোলনকে বৃহত্তর পরিসরে নিতে ছাত্রদলের সেক্রেটারি শফিউল বারী বাবু ভাই, সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল কাদের ভূঁইয়া জুয়েল ভাই, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সভাপতি হাসান মামুন ভাই, সেক্রেটারি সাইফুল ইসলাম ফিরোজ ভাই, সিনিয়র সহসভাপতি মামুনুর রশিদ মামুন ভাই এবং যুগ্ম সম্পাদক আকরামুল হাসান মিন্টু ভাই প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন।

আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে মূল ব্যাটলফিল্ডে পরিণত হয় স্যার এ এফ রহমান হল এলাকা। কারফিউ জারির আগমুহূর্ত পর্যন্ত আমি আশিক ভাইকে হল থেকেই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে দেখেছি। বলা যায়, এই আন্দোলনের কারণে এক-এগারোর ষড়যন্ত্র কার্যত ব্যর্থ হয় এবং ফখরুদ্দিন-মঈনউদ্দিন সরকার পরবর্তীতে নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়।

২০০৭ সালের আগস্ট আন্দোলনের প্রায় তিন মাস পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দেওয়া হয়। এরপর খোমেনি ইহসানের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে ‘নির্যাতন প্রতিরোধ ছাত্র আন্দোলন’। আমরা যারা সাইফুল ইসলাম ফিরোজ ভাইয়ের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম, তারা এই প্ল্যাটফর্মের কর্মসূচিতে সক্রিয়ভাবে অংশ নিই।

শফিউল বারী বাবু ভাই, আব্দুল কাদের ভূঁইয়া জুয়েল ভাই ও আকরামুল হাসান মিন্টু ভাইয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছাত্রদল নেতাকর্মীরাও এতে যুক্ত ছিলেন। বাস্তবিক অর্থে এক-এগারোর ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হওয়ার পূর্ণ কৃতিত্ব ছাত্রদল নেতাদেরই প্রাপ্য।

শফিউল বারী বাবু, আব্দুল কাদের ভুইয়া জুয়েল, হাসান মামুন, সাইফুল ইসলাম ফিরোজ, মামুনুর রশিদ মামুন, আকরামুল হাসান মিন্টু ও মফিজুর রহমান আশিক—তাঁরাই তখন জীবন বাজি রেখে রাজপথে বিএনপির মূলধারাকে আগলে রেখেছিলেন। তাঁদের অসীম সাহসের কারণেই আব্দুল মান্নান ভূঁইয়াসহ সংস্কারপন্থীদের সব অপচেষ্টা ব্যর্থ হয়।

যদিও আগস্ট আন্দোলনের ফলে এক-এগারো সরকারের ষড়যন্ত্র আপাতভাবে ব্যর্থ হয়, তবু তাদের অধীনে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটকে হারানো হবে—এমন একটি আভাস অনেকেই পেয়েছিলাম। সে আশঙ্কা সত্ত্বেও নির্বাচনে অংশ নেওয়া ছাড়া চারদলীয় জোটের সামনে কোনো বিকল্প ছিল না। ফলে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত কসমেটাইজড নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে।

এমন ফলাফল হবে আশঙ্কা থেকে আমি নির্বাচনের আগেই সার্টিফিকেটসহ এবং প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টসগুলো হল থেকে সরিয়ে ফেলি। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে স্যার এ এফ রহমান হলে আমার রুমেই প্রথম ভাংচুর হবে সেটা অনুমেয় ছিল। প্রথমত আমি আশিক ভাইয়ের কাজিন হিসেবে পরিচিত ছিলাম, দ্বিতীয়ত ২০১ নম্বর রুমে আশিক ভাইয়ের সিট বরাদ্দ নিয়েছিল হল ছাত্রলীগের সভাপতি ফারুক।

এই সিটে ওঠাকে কেন্দ্র করে তার সাথে আমার সরাসরি দ্বন্দ্ব শুরু হয়। ফলে নির্বাচনের পর যা অনুমেয় তাই হলো, আমার বই-তোশক-কাপড় চোপড়ে নির্বাচনের দিন রাতেই আগুন দেওয়া হলো।

নির্বাচনের দুই দিন পর, ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে সাইফুল ইসলাম ফিরোজ ভাই এক অসীম সাহসী উদ্যোগ নেন। ২০০৯ সালের ১ জানুয়ারি ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে তিনি সকালেই নেতা-কর্মী নিয়ে মধুর ক্যান্টিনে উপস্থিত হয়ে গেলেন।

ইতোমধ্যে সাংবাদিকতা শুরু করায় সাংবাদিক বড় ভাইদের সাথে আমরা প্রথমে মধুর ক্যান্টিন-কলা ভবন-আশেপাশে ঘুরে দেখি, ছাত্রলীগ কোথাও নেই।

হয়তো তারা তখনো হলে ঘুমাচ্ছে। এই খবর ফিরোজ ভাইকে জানানোর পর তিনি শহীদ মিনার থেকে তার নেতা-কর্মীদের নিয়ে মধুর ক্যান্টিনে এসে ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কেক কাটলেন। এই খবর ছাত্রলীগের কানে পৌছার পর তারা মধুর ক্যান্টিনে সমবেত হয়ে ছাত্রদলের ওপর হামলা করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়ে যায়। বলা যায়, ফিরোজ ভাইয়ের এই এক সাহসী উদ্যোগের ফলে প্রায় দশ মাস ছাত্রদল ঢাবি ক্যাম্পাসে সরব ছিলো। ঢাবি ছাত্রদলের পরের নেতৃত্ব সেটা ধরে রাখতে পারেনি।

শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদের সময়ও ঘুরেফিরে ১/১১ বিরোধী ছাত্রদল নেতারাই রাজপথে গুলির সামনে দাঁড়িয়েছিল, গুম–নির্যাতন–মামলার পাহাড় বয়ে দাঁড়িয়ে ছিল তারা। কিন্তু দুর্ভাগ্য ১/১১ বিরোধী ছাত্রদল নেতারাই ২০২৬ সালের নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি দলীয় মনোনয়ন বঞ্চনার শিকার হয়েছেন।

এই একটি বিষয় আমাকে অনেক বেশি আহত করেছে। তবু বিশ্বাস করি, বিএনপির আবার কোনো দুঃসময় এলে এক-এগারো বিরোধী আমার ভাইরাই আবার এগিয়ে আসবেন এবং সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের প্রধান শক্তিকে রক্ষা করবেন

যতদূর জানি, আব্দুল কাদের ভূঁইয়া জুয়েল ভাই নরসিংদী থেকে নির্বাচন করতে দলীয় মনোনয়ন চেয়েছিলেন। মনোনয়ন না পেয়ে দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছেন। জুলাই বিপ্লবের পরে অনলাইন-অফলাইনে সবচেয়ে মার্জিত রাজনীতিটা জুয়েল ভাই করেছে বলে আমার কাছে প্রতীয়মান। এছাড়া তার জেলার বাসিন্দা আমার দুই ছাত্রের কাছেও জুয়েল ভাই সম্পর্কে ইতিবাচক কথাই শুনেছি।

১/১১ বিরোধী ছাত্রদল নেতা হাসান মামুন ভাই দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে পটুয়াখালীতে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন। প্রাথমিক সোর্সের তথ্যানুযায়ী, তিনি সেখানে জিতে আসার কথা। আমার দেখা ছাত্রনেতাদের মধ্যে হাসান মামুন ভাইকে সবচেয়ে ইন্টেলেকচুয়াল মনে হয়। নিশ্চয়ই তিনি ভেবে শুনে নির্বাচনে থাকবেন নাকি থাকবেন না সিদ্ধান্ত নিবেন।

সাইফুল ইসলাম ফিরোজ ভাইও দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে ঝিনাইদহে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন। প্রাথমিক সোর্সের তথ্যানুযায়ী, তিনিও সেখানে জিতে আসবেন। তাঁর সাথে অসংখ্যবার শহীদ মিনারে এবং হাতিরপুল বাজারে কথা হয়েছে। তিনি বাবার পেনশনের টাকা এনে রাজনীতি করা মানুষ। গণ অধিকার পরিষদের রাশেদ খানের হাতে আসন ছেড়ে দিয়ে চলা আসলেই কঠিন। নিশ্চয়ই ফিরোজ ভাই সবকিছু বিবেচনা করে সঠিক সিদ্ধান্ত নিবেন- প্রত্যাশা রাখলাম।

মোহাম্মদ আকরামুল হাসান ভাইও নরসিংদীর শিবপুর থেকে নির্বাচন করতে দলীয় মনোনয়ন চেয়েছিলেন। শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত তিনি নির্বাচনী মাঠেই ছিলেন। ছাত্রদলের কোন সাবেক নেতা দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার জন্য এত চেষ্টা করেছেন বলে আমার মনে হয়নি। নিবার্চনী আসনে এত সক্রিয় ভূমিকার পরেও তার মনোনয়ন না পাওয়া আমাকে অনেক বেশি আহত করেছে।

মামুনুর রশিদ মামুন ভাই নোয়াখালী থেকে নির্বাচন করতে দলীয় মনোনয়ন চেয়েছিলেন। কিন্তু একই আসনে বিএনপির সিনিয়র নেতা থাকায় যথারীতি প্রতিবারের মতো তিনি বঞ্চিতই থাকলেন। আশিক রহমান আশিক ভাই চট্টগ্রামের বাঁশখালী আসন থেকে নির্বাচন করতে দলীয় মনোনয়ন চেয়েছিলেন। কিন্তু নানা সমীকরণে তাকেও মনোনয়ন বঞ্চিত থাকতে হয়েছে।

আশিক ভাই সম্পর্কে একটি কথা না বললে নয়, সেটা হচ্ছে, ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা আমলে সবচেয়ে বেশি রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রামে ছিল, ত্যাগ শিকার করেছে, এমন মানুষের হিসেবে করলে আশিক ভাই একেবারে শুরুতেই থাকবেন। তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যে কিনা শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী আমলে দুইবার গুমের শিকার হয়েছেন। ভালো থাকবেন এক-এগারো বিরোধী ছাত্রদল ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতারা।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও প্রাক্তন সহকারী অধ্যাপক, উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

এলাকার খবর

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত