খামেনির মৃত্যু, দিল্লির কূটনীতিতে বড় ধাক্কা

সংবাদপত্র প্রতিবেদক
 ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হয়েছেন বলে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সূত্রে খবর প্রকাশিত হয়েছে। এ ঘটনার পর মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। ওয়াশিংটন ও তেল আবিবে উচ্ছ্বাসের খবর মিললেও নয়াদিল্লিতে দেখা দিয়েছে গভীর উদ্বেগ। ইরানের নেতৃত্বে এ পরিবর্তন ভারতের পররাষ্ট্রনীতিতে তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।

ভারত সরকার এখন পর্যন্ত ইসরাইল ও ইরান সংঘাতে আনুষ্ঠানিকভাবে নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রেখেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন সরকার কেবল শান্তি ও সংযমের আহ্বান জানিয়েছে। কারণ ইসরাইল ও ইরান দুদেশই ভারতের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। এমন পরিস্থিতিতে খামেনির মৃত্যু দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। 

ইরান দীর্ঘদিন ধরে ভারতের কৌশলগত অংশীদার। শুধু কূটনৈতিক সম্পর্ক নয়, ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কও দুদেশের মধ্যে গভীর। কাশ্মীর ইস্যুসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে অতীতে তেহরান ভারতের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে বলে কূটনৈতিক মহলে উল্লেখ করা হয়। ফলে ইরানের নেতৃত্বে বড় ধরনের পরিবর্তন হলে সেই সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বিশেষ করে ইরানের সিস্তান-বেলুচিস্তান প্রদেশে অবস্থিত চাবাহার বন্দর ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই বন্দর ব্যবহার করে পাকিস্তানকে এড়িয়ে আফগানিস্তান ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য করে ভারত। কাজাখস্তান ও তুর্কমেনিস্তানের মতো দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগেও এই পথ ব্যবহার করা হয়। 

চাবাহার বন্দরকে কেন্দ্র করে ভারত বহু বছর ধরে বিনিয়োগ করেছে এবং এটিকে আঞ্চলিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ করিডর হিসেবে গড়ে তুলেছে। ইরানে যদি রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটে এবং যুক্তরাষ্ট্রপন্থী কোনো সরকার ক্ষমতায় আসে, তাহলে চাবাহার প্রকল্পের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এতে ভারতের আঞ্চলিক বাণিজ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

মধ্য এশিয়ায় ভারতের প্রভাব কমে গেলে সেই শূন্যতা কাজে লাগাতে পারে চীন ও পাকিস্তান। চীন ইতোমধ্যে পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার মাধ্যমে আঞ্চলিক প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছে। চাবাহার বন্দর কার্যকর না থাকলে আফগানিস্তান হয়ে মধ্য এশিয়ার সঙ্গে ভারতের সংযোগ দুর্বল হয়ে পড়বে। এতে বাণিজ্য ও কৌশলগত সুবিধা হারানোর ঝুঁকি তৈরি হবে।

ইরানের মাধ্যমে রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যের একটি অংশ পরিচালিত হয়। ইউরেনিয়াম ও রেয়ার আর্থ খনিজসহ গুরুত্বপূর্ণ পণ্য পরিবহনেও এই রুট ব্যবহৃত হয়। ইরানে রাজনৈতিক পরিবর্তন হলে সেই বাণিজ্যিক সম্পর্কেও প্রভাব পড়তে পারে। ফলে ভারতের আমদানি-রপ্তানি ব্যবস্থায় নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

কূটনৈতিক সূত্র বলছে, ইরানের ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন এলে পাকিস্তান পরিস্থিতির সুযোগ নিতে পারে। অতীতে যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের নজির রয়েছে। ইরান দুর্বল হলে এই অঞ্চলে পাকিস্তানের ভূমিকা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে ভারতের কৌশলগত অবস্থান পুনর্বিবেচনা করতে হতে পারে।

এদিকে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পরিস্থিতির ওপর নিবিড় নজর রাখছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর কূটনৈতিক মহলে সক্রিয় যোগাযোগ বজায় রেখেছেন বলে জানা গেছে। সরকারি পর্যায়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। তবে নয়াদিল্লি পরিস্থিতি বিবেচনায় পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে তেহরানে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। ভারতের জন্য ইরান একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হওয়ায় এই পরিবর্তন নয়াদিল্লির কূটনীতিতে তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। এখন পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকেই তাকিয়ে আছে আন্তর্জাতিক মহল।

এলাকার খবর

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত