এসো, একসঙ্গে আমরা একটা আশীর্বাদপুষ্ট জীবন কাটাই: রাশমিকা

সংবাদপত্র প্রতিবেদক
 ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

দীর্ঘ জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হলেন দক্ষিণী সিনেমা ইন্ডাস্ট্রির জনপ্রিয় অভিনেতা বিজয় দেবেরাকোন্ডা ও অভিনেত্রী রাশমিকা মান্দানা। বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) সাতপাকে বাঁধা পড়লেন এ তারকা জুটি। রাজস্থানের ঐতিহাসিক শহর উদয়পুরে পারিবারিক ও ঘনিষ্ঠ আয়োজনে বিলাসবহুল রিসোর্টে তাদের  বিয়ের সম্পন্ন হয়। রাজকীয় আবহ, কড়া গোপনীয়তা, ঐতিহ্যবাহী আচার আর তারুণ্যের উচ্ছ্বাস—সব মিলিয়ে আয়োজনটি ছিল এককথায় রূপকথার মতো।

অভিনেত্রী রাশমিকা মান্দানা ও বিজয় দেবেরাকোন্ডার প্রেমের গুঞ্জন শুরু হয় ‘গীত গোবিন্দম’ সিনেমার সেট থেকে। পরবর্তী সময়ে ‘ডিয়ার কমরেড’-এ তাদের রসায়ন সিনেমাপ্রেমী দর্শকদের মুগ্ধ করে। যদিও প্রকাশ্যে কখনো সম্পর্কের কথা স্বীকার করেননি এ তারকা জুটি। একসঙ্গে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উপস্থিতি ও ভ্রমণই ইঙ্গিত দিয়েছিল ঘনিষ্ঠতার।

শেষ মুহূর্তে বিয়ের গোপনীয়তা খোলাসা করেন তারা। বিয়ের কয়েক দিন আগে সামাজিক মাধ্যমে ‘দ্য ওয়েডিং অব বিরোশ’ নাম দিয়ে ঘোষণা দেন এ তারকা জুটি। এরপর থেকেই বিনোদন জগতের সবখানেই শুরু হয় তুমুল আলোচনা।

বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) ভোরের শান্ত আবহে শুরু হয় বিয়ের মূল আনুষ্ঠানিকতা। তেলেগু রীতি অনুযায়ী প্রথমে গণেশপূজা ও পূর্বপুরুষদের স্মরণ করে মঙ্গলাচরণ করা হয়। এরপর অগ্নি সাক্ষী রেখে সম্পন্ন হয় ‘সপ্তপদী’—সাতটি প্রতীকী পদক্ষেপ, যা দাম্পত্য জীবনের সাতটি অঙ্গীকারের প্রতীক। পুরোহিতের মন্ত্র উচ্চারণের মধ্য দিয়ে কনে-বর অগ্নি প্রদক্ষিণ করেন। এরপর মালাবদল, কন্যাদান ও আশীর্বাদের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয় বিয়ে। বিয়ের রীতি অনুযায়ী পরিবার-পরিজনের প্রবীণ সদস্যরা নবদম্পতির কপালে কুমকুম ও হলুদ ছুঁইয়ে আশীর্বাদ জানান। এভাবে শেষ হয় সকালের পর্ব।

এরপর বিকালে শুরু হয় কোডাভা রীতি অনুযায়ী দ্বিতীয় পর্ব। কর্নাটকের কোডাগু অঞ্চলের এই ঐতিহ্যে পোশাক, সংগীত ও আচার-অনুষ্ঠানে থাকে আলাদা বৈশিষ্ট্য। কনের পারিবারিক শিকড়কে সম্মান জানিয়ে এ পর্ব রাখা হয়। দুই ভিন্ন সাংস্কৃতিক ধারার এই বৈবাহিক বন্ধন এনে দেয় অনন্য মাত্রা। একদিকে তেলেগু আচার, অন্যদিকে কোডাভা ঐতিহ্য—দুটোর সমন্বয়েই যেন তৈরি হয় পূর্ণতা। রাজকীয় স্থাপত্য, লেকঘেরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর সুসজ্জিত মণ্ডপ—সব মিলিয়ে ছিল নান্দনিক পরিবেশ।

অতিথিদের তালিকা রাখা হয় সীমিত; শুধু দুই পরিবারের সদস্য, ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও ইন্ডাস্ট্রির অল্প কয়েকজন আমন্ত্রিত। এর মধ্যে ব্যক্তিগত মুহূর্তের গোপনীয়তা বজায় রাখতে মুঠোফোন ব্যবহার ও ছবি তোলায় ছিল কঠোর বিধিনিষেধ। আমন্ত্রণপত্রেও সে কথা উল্লেখ ছিল— অনুষ্ঠানটি যেন সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত থাকে।

বিয়ের আসরে কনে রাশমিকা মান্দানার পরনে ছিল মরচে-কমলারঙা সোনালি পাড়ের শাড়ি, যার সঙ্গে ভারি সোনালি কাজের ব্লাউজ। ঐতিহ্যবাহী সোনার গহনায় সজ্জিত ছিলেন তিনি—বহুস্তর হার, বাহুবন্ধ, মাঙ্গটিকা, কড়া ও বড় ঝুমকা। খোলা ঢেউখেলানো চুলে জুঁই ফুলের মালা তার সাজে এনে দেয় দক্ষিণী ঐতিহ্যের কোমল সৌন্দর্য।  বিয়ের এই বিশেষ পোশাকটি ডিজাইন করেছেন খ্যাতনামা ডিজাইনার অনামিকা খান্না। স্টাইলিংয়ে ছিল সাবেকি ঘরানার ছোঁয়া, যা কনের আভিজাত্যকে আরও উজ্জ্বল করেছে।

অন্যদিকে বর বিজয় দেবেরাকোন্ডা পরেছিলেন আইভরি রঙের ধুতি–শৈলীর পোশাক, সঙ্গে গাঢ় সিঁদুররঙা অঙ্গবস্ত্র। অঙ্গবস্ত্রে সূক্ষ্ম সূচিকর্মে ফুটে উঠেছিল অরণ্য ও মন্দিরের নকশা—শক্তি ও পবিত্রতার প্রতীক। কানে দুল, সোনার কোমরবন্ধ ও হার তার সাজকে সম্পূর্ণ করে।

বরমালার সময় আবেগে ভেঙে পড়েন দুজনই। সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায়, একে অপরকে মালা পরানোর সঙ্গে সঙ্গেই চোখে পানি চলে আসে তাদের। বিয়ের আড়ালে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে পারিবারিক রীতি ও দক্ষিণী সংস্কৃতির ঐতিহ্য। অতিথিদের আপ্যায়নে ছিল সম্পূর্ণ দক্ষিণ ভারতীয় ধাঁচ—কলাপাতায় পরিবেশন করা হয় নানা পদ।

বিয়ের আয়োজনের বেশি গুরুত্ব পেয়েছে পারিবারিক রীতি ও দক্ষিণী সংস্কৃতির ঐতিহ্য। অতিথিদের আপ্যায়নে ছিল সম্পূর্ণ দক্ষিণী ভারতীয় ধাঁচ—কলাপাতায় পরিবেশন করা হয় নানা পদ। ভাত, সাম্বর, রসম, বিভিন্ন সবজিভাজা ও কারি, পায়েস ও ঐতিহ্যবাহী মিষ্টান্ন—সবই সাজানো হয় পরম যত্নে। পরিবেশনের ধরনেও ছিল নিয়ম মেনে বিন্যাস; কলাপাতার নির্দিষ্ট অংশে নির্দিষ্ট পদ রাখা হয়, যা দক্ষিণী সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

আর সেই সঙ্গে বিয়েতে পানীয় হিসেবে পরিবেশন করা হয় ডাবের পানি, যা সতেজতার পাশাপাশি শুভতার প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত। দক্ষিণী রীতিনীতি অনুযায়ী কনের পরিবার থেকে বরের পরিবারকে উপহার দেওয়া হয় নারিকেল, পানপাতা, ফল, মিষ্টি, হলুদ ও কুমকুম। এসব উপকরণ সমৃদ্ধি, শুভলক্ষণ ও নতুন জীবনের আশীর্বাদের প্রতীক। নারিকেল ধরা হয় পবিত্রতার চিহ্ন, আর হলুদ ও কুমকুম দাম্পত্য জীবনের মঙ্গল কামনার প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে বরের পরিবারের পক্ষ থেকেও ছিল আবেগঘন এক মুহূর্ত।

বিজয়ের মা পারিবারিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে নববধূ রাশমিকা মান্দানার হাতে বংশপরম্পরায় পাওয়া সোনার চুড়ি পরিয়ে দেন। এ আচার শুধু অলংকার প্রদান নয়; এটি নববধূকে দেবেরাকোন্ডা পরিবারের সদস্য হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার প্রতীক। আশীর্বাদের হাত রেখে তাকে স্বাগত জানান শ্বশুরবাড়ির মুরব্বিরা। সে মুহূর্তে উপস্থিত স্বজনদের চোখেমুখে ছিল আনন্দ আর আবেগের মিশেল—একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনায় দুই পরিবারের বন্ধন আরও দৃঢ় হয়ে ওঠে।

এলাকার খবর

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত