দেশের মধ্যে রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় সংক্রামক ব্যাধি হামের প্রাদুর্ভাব বেশি। বিভাগের ২৬টি এলাকাকে সংক্রামক হাম রোগের হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, শিশুদের পাশাপাশি বয়স্করাও ছোঁয়াচে হামে আক্রান্ত হচ্ছেন।
কয়েকটি নমুনা পরীক্ষার পর বয়স্কদের আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামে বয়স্কদের আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি।
এদিকে শনিবার দুপুর পর্যন্ত রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ২৫ জন শিশুকে ভর্তি করা হয়েছে। গত শনিবার দুপুর পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় রাজশাহী মেডিকেলে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বর্তমানে হামের উপসর্গ নিয়ে ১৪৯ জন চিকিৎসাধীন আছে।
এ পর্যন্ত ৩৭৭ জন শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে রাজশাহী মেডিকেলে ভর্তি হয়েছে। তাদের মধ্যে শুধু রাজশাহী মেডিকেলেই ৩৮ জন শিশুর মৃত্যুর বিষয়টি রেকর্ড করা হয়েছে। ২৪ ঘণ্টায় চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে পরিবারে ফিরেছে ৩ হাম আক্রান্ত শিশু।
এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শংকর কুমার বিশ্বাস।
রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. হাবিবুর রহমান জানান, হাম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। দুই সপ্তাহ আগেও পরিস্থিতি অনেকটাই খারাপ ছিল। তবে সচেতনতা বৃদ্ধি ও নিবিড় চিকিৎসা কার্যক্রমের পর পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। সংক্রমণের হার কমে আসছে। শনিবার আট জেলার সিভিল সার্জনসহ স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের নিয়ে জরুরি সভা হয়েছে। হাম নিয়ন্ত্রণে নিবিড় চিকিৎসা সেবা জোরদারসহ টিকাদান কার্যক্রম শুরুর সিদ্ধান্ত হয়েছে। এছাড়া বিভাগের কোন এলাকায় হামের প্রাদুর্ভাব বেশি সেগুলিকে চিহ্নিত করে ওইসব এলাকায় স্বাস্থ্য কার্যক্রম জোরদারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের দপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ সেলের তথ্যমতে, বর্তমানে বিভাগের আট জেলার বিভিন্ন হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য কেন্দ্রে ২২৯ জনকে হাম সংক্রমণ ও হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তবে নমুনা পরীক্ষায় বিভাগে এ পর্যন্ত ১৪৩ জনের হাম আক্রান্তের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে।
গত জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত বিভাগে হামে আক্রান্ত হয়ে ৫৫ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে বিভিন্ন পক্ষে দাবি করা হলেও সরকারি হিসাবে এই সংখ্যা ১৭ জন।
অন্যদিকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হাম আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ৩৮ শিশুর।
ভুক্তভোগী একাধিক পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্বাস্থ্য বিভাগ হামের প্রাদুর্ভাব, সংক্রমণ ও শিশু মৃত্যুর তথ্য আড়াল করছে। একেক সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের তথ্য একেক রকম এবং সংখ্যায় বড় গরমিল দেখা যাচ্ছে।
সূত্রমতে, রাজশাহী বিভাগের ২৬টি এলাকাকে হাম সংক্রমণের হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশের বয়স ৬ মাসের নিচে হলেও এবার বয়স্করাও আক্রান্ত হচ্ছেন এমন প্রমাণ মিলেছে।
সর্বশেষ শুক্রবার পর্যন্ত করা নমুনা পরীক্ষার বিপরীতে সংক্রমণের হার দাঁড়িয়েছে ৩৪ দশমিক ৭০ শতাংশ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রোববার থেকে বিশেষ টিকাদান কার্যক্রম শুরু হচ্ছে রাজশাহী বিভাগের উপদ্রুত এলাকাগুলিতে।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক দপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ বিভাগের সহকারী পরিচালক ডা. রোজী আরা খাতুন।
রাজশাহী মেডিকেল হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শংকর কুমার বিশ্বাস জানান, ইতোমধ্যে ৪০ শয্যার একটি হাম আইসোলেশন ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে। এছাড়া শিশু ও মেডিসিন বিভাগের প্রতিটি ওয়ার্ডে আইসোলেশন কর্নার রাখা হয়েছে। প্রয়োজনে একটি শিশু ওয়ার্ড সম্পূর্ণভাবে হাম আইসোলেশন ওয়ার্ড করার প্রস্তুতি চলছে।
তিনি আরও জানান, পরিস্থিতি মোকাবিলায় শিশু ওয়ার্ডে অতিরিক্ত অক্সিজেন লাইন স্থাপন করা হচ্ছে। পেডিয়াট্রিক আইসিইউতে বেড সংখ্যা ১২ থেকে বাড়িয়ে ১৮টি করা হয়েছে, যার মধ্যে ১২টি হাম আক্রান্ত শিশুদের জন্য নির্ধারিত।