মুমিনের আখিরাত যখন দূরে সরে যায়

সংবাদপত্র প্রতিবেদক
 ছবি: সংগৃহীত
ছবি: সংগৃহীত

মানুষের হৃদয় এক অদ্ভুত ময়দান। সেখানে একই সঙ্গে দুনিয়া ও আখিরাতের ভালোবাসা সমানভাবে জায়গা করে নিতে পারে না। প্রখ্যাত তাবেঈ সাধক হজরত মালিক ইবনু দিনার (রহ.)-এর একটি গভীর উক্তি আমাদের সেই বাস্তবতাই স্মরণ করিয়ে দেয়। তিনি বলেন—

‘দুনিয়ার জন্য যত চিন্তা করবে, অন্তর থেকে পরকালের চিন্তা তত কমে যাবে। আর পরকালের জন্য যে পরিমাণ চিন্তা করবে, অন্তর থেকে দুনিয়ার চিন্তাই সে পরিমাণ দূর হয়ে যাবে।’

এ বাণী শুধু একটি নসিহত নয়; এটি ইমানের ভারসাম্য রক্ষার এক চিরন্তন দিকনির্দেশনা। আজকের ব্যস্ত, প্রতিযোগিতামূলক ও ভোগবাদী সমাজে এই বাণীর গুরুত্ব আরও বেশি। কুরআন ও হাদিসে বারবার দুনিয়ার মোহ থেকে সতর্ক করে আখিরাতমুখী জীবনের আহ্বান জানানো হয়েছে।

কুরআনের আলোকে দুনিয়া ও আখিরাত

১️. দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী

আল্লাহ তাআলা বলেন—

وَمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا لَعِبٌ وَلَهْوٌ ۖ وَلَلدَّارُ الْآخِرَةُ خَيْرٌ لِّلَّذِينَ يَتَّقُونَ ۗ أَفَلَا تَعْقِلُونَ

‘দুনিয়ার জীবন তো খেল-তামাশা ছাড়া কিছু নয়। আর আখিরাতের আবাসই মুত্তাকিদের জন্য উত্তম। তবে কি তোমরা বুঝ না?’ (সুরা আল-আনআম: আয়াত ৩২)

২️. আখিরাতকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশ

আল্লাহ তাআলা বলেন—

مَنْ كَانَ يُرِيدُ حَرْثَ الْآخِرَةِ نَزِدْ لَهُ فِي حَرْثِهِ ۖ وَمَنْ كَانَ يُرِيدُ حَرْثَ الدُّنْيَا نُؤْتِهِ مِنْهَا وَمَا لَهُ فِي الْآخِرَةِ مِنْ نَصِيبٍ

‘যে আখিরাতের ফসল কামনা করে, আমি তার জন্য তার ফসল বৃদ্ধি করে দেই। আর যে দুনিয়ার ফসল কামনা করে, তাকে সেখান থেকে কিছু দেই; কিন্তু আখিরাতে তার কোনো অংশ থাকবে না।’ (সুরা আশ-শুরা: আয়াত ২০)

৩️. দুনিয়া যেন ধোঁকা না দেয়

আল্লাহ তাআলা বলেন—

يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّ وَعْدَ اللَّهِ حَقٌّ فَلَا تَغُرَّنَّكُمُ الْحَيَاةُ الدُّنْيَا

‘হে মানুষ! নিশ্চয়ই আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য; সুতরাং দুনিয়ার জীবন যেন তোমাদের ধোঁকায় না ফেলে।’ (সুরা ফাতির: আয়াত ৫)

সমৃদ্ধি দান করেন, তার কাজগুলো গুছিয়ে দেন এবং দুনিয়া তার কাছে অবনত হয়ে আসে।’ (তিরমিজি ২৪৬৫)

৬. প্রকৃত সফলতা কার?

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

الدُّنْيَا سِجْنُ الْمُؤْمِنِ وَجَنَّةُ الْكَافِرِ

‘দুনিয়া মুমিনের জন্য কারাগার এবং কাফিরের জন্য জান্নাত।’ (মুসলিম ২৯৫৬)

হজরত মালিক ইবনু দিনার (রহ.)-এর বাণীর তাৎপর্য

হজরত মালিক ইবনু দিনার (রহ.) ছিলেন তাবেঈ যুগের অন্যতম বিখ্যাত জাহিদ ও আল্লাহভীরু সাধক। তার জীবন ছিল দুনিয়ার চাকচিক্য ত্যাগ করে আখিরাতের প্রস্তুতিতে নিবেদিত। তিনি বুঝেছিলেন—

  • হৃদয় একটিই
  • সেখানে যদি দুনিয়ার দুশ্চিন্তা ভর করে, তবে আখিরাতের প্রস্তুতির জায়গা সংকুচিত হয়
  • আর যদি আখিরাতের ভয় ও আশা প্রবল হয়, দুনিয়ার অযথা উদ্বেগ দূর হয়ে যায়

এটাই ইমানের ভারসাম্য।

আমাদের করণীয়

১️. প্রতিদিন কুরআন তিলাওয়াত ও তাদাব্বুর

আখিরাতের স্মরণ হৃদয়কে নরম রাখে।

২️. পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ খুশু-খুজুর সঙ্গে আদায়

নামাজ আখিরাতমুখী জীবনের মূলভিত্তি।

৩️. মৃত্যুচিন্তা ও কবরের স্মরণ

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

أَكْثِرُوا ذِكْرَ هَادِمِ اللَّذَّاتِ

‘স্বাদ নষ্টকারী (মৃত্যু)-এর কথা বেশি বেশি স্মরণ করো।’ (তিরমিজি ২৩০৭)

৪️. দান-সদকা বৃদ্ধি করা

দুনিয়ার সম্পদকে আখিরাতের পুঁজি বানানোই প্রকৃত বুদ্ধিমত্তা।

৫️. দুনিয়ার চিন্তা নিয়ন্ত্রণ

রিজিক আল্লাহর হাতে—

وَمَا مِن دَابَّةٍ فِي الْأَرْضِ إِلَّا عَلَى اللَّهِ رِزْقُهَا

‘যমীনে বিচরণশীল এমন কোন জীব নেই যার জীবিকার দায়িত্ব আল্লাহর উপর নেই।’ (সুরা হুদ: আয়াত ৬)

৬️. সৎ সঙ্গ গ্রহণ

আখিরাতমুখী মানুষের সঙ্গ হৃদয়কে পরিশুদ্ধ রাখে।

দুনিয়া আমাদের গন্তব্য নয়; এটি পরীক্ষার স্থান। হজরত মালিক ইবনু দিনার (রহ.)-এর বাণী আমাদের মনে করিয়ে দেয়— হৃদয়ের দখলদারিত্ব যার, জীবন তার দিকেই মোড় নেয়। যদি হৃদয়ে আখিরাতের চিন্তা স্থান পায়, তবে দুনিয়ার ঝড়ও মানুষকে ভেঙে দিতে পারে না। আর যদি দুনিয়াই হৃদয়ের রাজা হয়ে যায়, তবে শান্তি অধরাই থেকে যায়। আসুন, আমরা দুনিয়াকে হাতের মধ্যে রাখি, কিন্তু হৃদয়ের মধ্যে নয়— আর আখিরাতকে রাখি হৃদয়ের গভীরে।

এলাকার খবর

পাঠকের আগ্রহ

সম্পর্কিত